মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ আদর্শ ‘সত্য’ বা ‘হক’। “সত্যের জন্য সবকিছু ত্যাগ করো, কিন্তু কোনো কিছুর জন্য সত্যকে ত্যাগ করো না”—হযরত আলী (রা.)। এই নীতিবাক্যটি কেবল একটি নৈতিক শিক্ষাই নয়; বরং এটি ঈমান, তাওহীদ, ইখলাস ও আধ্যাত্মিক উন্নতির মূল ভিত্তি। ইসলাম ও সূফীবাদের গভীর তত্ত্ব বিশ্লেষণ করলে প্রতীয়মান হয় যে, এই বাক্যের প্রতিটি শব্দ মানুষের আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক পূর্ণাঙ্গ পথনির্দেশ।
ইসলামে ‘সত্য’ বলতে কেবল কথার সত্যতাকে বোঝানো হয় না; বরং এর মূল অর্থ হলো ‘আল-হক’—অর্থাৎ মহান আল্লাহ নিজেই। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: “এটা এজন্য যে, আল্লাহই একমাত্র সত্য।” (সূরা হজ: ৬২)। সুতরাং ‘সত্য’ মানে আল্লাহর সত্তা, তাঁর নির্দেশ এবং তাঁর নির্ধারিত পথ। সূফীদের মতে, সত্য হলো সেই চিরন্তন নূর, যা মানুষের অন্তরের অন্ধকার দূর করে তাকে প্রকৃত বাস্তবতার দিকে পরিচালিত করে। তাই সত্যকে আঁকড়ে ধরা মানে আল্লাহর সঙ্গে সংযুক্ত থাকা, আর সত্যকে ত্যাগ করা মানে সেই পরম সম্পর্ক ছিন্ন করা।
পবিত্র কুরআন বারবার মানুষকে সত্যের ওপর দৃঢ় থাকার নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন: “তুমি দৃঢ়ভাবে স্থির থাকো, যেমন তোমাকে আদেশ করা হয়েছে।” (সূরা হুদ: ১১২)। পুনরায় সতর্ক করে বলা হয়েছে: “আমার আয়াতসমূহের বিনিময়ে সামান্য মূল্য গ্রহণ করো না।” (সূরা বাকারা: ৪১)। এই আয়াতগুলো স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, দুনিয়ার কোনো স্বার্থ, লাভ বা প্রলোভনের বিনিময়ে সত্যকে বিকিয়ে দেওয়া যাবে না। বরং সত্যের জন্য প্রয়োজনে দুনিয়ার সবকিছু বিসর্জন দিতে হবে—এটাই প্রকৃত ঈমানের দাবি।
ইসলামের ইতিহাসে নবী-রাসূলগণ এই নীতির কালজয়ী উদাহরণ স্থাপন করেছেন। হযরত ইব্রাহিম (আ.) সত্যের জন্য অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হয়েছিলেন; তবুও তিনি শিরকের সঙ্গে কোনো আপস করেননি। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (দ.)-কে যখন দুনিয়ার ক্ষমতা ও সম্পদের প্রলোভন দেখিয়ে সত্য প্রচার থেকে বিরত থাকার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, তখন তিনি দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করেছিলেন:
“আমার এক হাতে সূর্য আর অন্য হাতে চাঁদ এনে দিলেও আমি এই সত্য থেকে বিচ্যুত হবো না।” এই অটলতা প্রমাণ করে যে, সত্যের মূল্য জগতের সকল সম্পদের চেয়ে অধিক।
হাদীস শরীফেও সত্যের গুরুত্ব অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “সত্য কথা বলো, যদিও তা তিক্ত হয়।” তিনি আরও বলেন: “জালিম শাসকের সামনে সত্য কথা বলা সর্বোত্তম জিহাদ।” এসব বাণী থেকে স্পষ্ট হয় যে, সত্যের পথ কণ্টকাকীর্ণ ও বিপজ্জনক হতে পারে; তবে সত্য ত্যাগ করা ঈমানের দুর্বলতার পরিচায়ক।
সূফীবাদের দৃষ্টিতে সত্যের জন্য ত্যাগ স্বীকার করা মানে কেবল বাহ্যিক সম্পদের বিসর্জন নয়; বরং নিজের ‘নফস’ বা অহংকারকে চূর্ণ করা। হযরত ইমাম আল-গাজ্জালী (রহ.)-এর মতে, যে ব্যক্তি সত্যের সন্ধান করতে চায়, তাকে প্রথমেই নিজের নফসকে কোরবানি দিতে হবে। হযরত মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি (রহ.) বলেছেন, সত্যের পথে আসতে হলে নিজের মিথ্যা সত্তাকে ধ্বংস করা অনিবার্য। আবার হযরত ইবনে আরাবি (রহ.)-এর দর্শনে, সত্য এক ও অদ্বিতীয়; কিন্তু মানুষের অজ্ঞতা ও অহংকার তা আড়াল করে রাখে। তাই সত্যের পথে চলতে আত্মশুদ্ধি অপরিহার্য।
সূফী দর্শনে এই ত্যাগের চূড়ান্ত রূপ হলো ‘ফানা ফিল্লাহ’—অর্থাৎ নিজের অস্তিত্বকে আল্লাহর সত্তায় বিলীন করে দেওয়া। আর ‘বাকা বিল্লাহ’ হলো সেই মাকাম, যেখানে মানুষ সত্যকে আঁকড়ে ধরে আল্লাহর সঙ্গে স্থায়ী সম্পর্ক লাভ করে। এই দুই স্তরই প্রমাণ করে যে, সত্যের জন্য আত্মত্যাগ করার অর্থই হলো চূড়ান্ত পর্যায়ে আল্লাহকে লাভ করা।
ইতিহাসের পাতায় যুগে যুগে অনেক মনীষী সত্যের জন্য চরম ত্যাগ স্বীকার করেছেন। হযরত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) অমানুষিক নির্যাতনের মুখেও সত্য আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। হযরত বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.) দুনিয়ার যাবতীয় মোহ ত্যাগ করে আল্লাহর প্রেমে নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন। তাঁদের জীবন আমাদের এই শিক্ষাই দেয় যে, সত্যের পথে কষ্ট সহ্য করাই ঈমানের প্রকৃত কষ্টিপাথর।
তবে মানুষ প্রায়শই জাগতিক মোহে সত্যকে ত্যাগ করে। কুরআন এ বিষয়ে সতর্ক করে বলে: “তোমরা দুনিয়ার জীবনকেই প্রাধান্য দাও।” (সূরা আ’লা: ১৬)। দুনিয়ার লোভ, লোকভয়, সামাজিক চাপ, নফসের কামনা এবং অজ্ঞতাই মানুষকে সত্যচ্যুত করে। অথচ যে ব্যক্তি সত্যকে ধ্রুবতারা করে পথ চলে, সে লাভ করে অন্তরের প্রশান্তি, আল্লাহর নৈকট্য, আখিরাতের সফলতা এবং এক মহিমান্বিত জীবন।
পরিশেষে বলা যায়, সত্যের পথ বন্ধুর হলেও এর গন্তব্য হচ্ছে চিরন্তন সার্থকতা। সত্যের জন্য সবকিছু ত্যাগ করলে নিজেকে হয়তো সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত মনে হতে পারে; কিন্তু আত্মিকভাবে সে লাভ করে পরম মুক্তি। পক্ষান্তরে, দুনিয়ার তুচ্ছ স্বার্থে যে সত্যকে বিসর্জন দেয়, সে বাহ্যিকভাবে সফল মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে রিক্ত ও শূন্য। তাই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমাদের এই নীতি ধারণ করা আবশ্যক।
আল্লাহ সোবহানু তা'য়ালা আমরা হীন দাসগণকে যেন রাহবারে আলম হযরত সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মাইজভাণ্ডারী (মঃজিঃআঃ) (প্রকাশ মওলা হুজুর মাইজভাণ্ডারী) কেবলা কাবার উসিলায় সদাসর্বদা পরম সত্যের উপর সুদৃঢ় বিশ্বাসে অটল থাকার সর্বোত্তম তৌফিক দান করেন সেই ফরিয়াদ করছি। -আমিন।
~মোহাম্মদ শাহেদ আলী চৌধুরী।