
২০২৬ সালের উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় হবিগঞ্জ জেলার আজমিরীগঞ্জ উপজেলায় সামগ্রিকভাবে একটি হতাশাজনক চিত্র ফুটে উঠেছে। উপজেলার শিক্ষাব্যবস্থা, বিশেষ করে প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর এমন বিপর্যয় স্থানীয় সচেতন মহল, শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে।
এক নজরে ২০২৬ সালের এইচএসসি ফলাফল (আজমিরীগঞ্জ সরকারি কলেজ )
মোট পরীক্ষার্থী: ৪৯২ জন
মোট পাস করেছেন: ১৮৭ জন
উপজেলায় গড় পাসের হার: ৩৮.০১ শতাংশ
জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা: শূন্য (০)
প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণদ্রষ্টব্য: প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী আজমিরীগঞ্জ সরকারি কলেজে পাসের হার সবচেয়ে কম (৩৪.৭৩%), যেখানে পাহাড়পুর আদর্শ কলেজ তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থেকে ৫৯.৬৮% পাসের হার অর্জন করেছে।
পিছিয়ে পড়ার কারণসমূহ: কোথায় মূল ঘাটতি?
উপজেলার সার্বিক ফলাফল এবং ঐতিহ্যবাহী ও প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজমিরীগঞ্জ সরকারি কলেজ-এর এই শোচনীয় অবস্থার পেছনে বেশ কিছু অন্তরায় রয়েছে বলে মনে করেন শিক্ষাবিদেরা:
১. শিক্ষক সংকট ও পাঠদান প্রক্রিয়ার ঘাটতি: অনেক প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত সংখ্যক বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।
২. শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতির অভাব: কলেজে নিয়মিত ক্লাস করার প্রবণতা কমে যাওয়া এবং প্রাইভেট বা কোচিংনির্ভরতা বেড়ে যাওয়ার ফলে মূল পাঠ্যবই থেকে শিক্ষার্থীরা দূরে সরে যাচ্ছে।
৩. বিজ্ঞান ও অন্যান্য কঠিন বিষয়ে দুর্বলতা: ইংরেজি, আইসিটি ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে পাসের হার আশঙ্কাজনকভাবে কম হওয়ার কারণে সামগ্রিক পাসের হার নিচে নেমে গেছে।
৪. মনিটরিং ও জবাবদিহিতার ঘাটতি: অভিভাবক ও কলেজ কর্তৃপক্ষের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ওপর কঠোর নজরদারির অভাব রয়েছে।
৫. শ্রেণিকক্ষ বাইরে distractions (বিচ্যুতি): ডিজিটাল মাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং পড়াশোনা থেকে মনোযোগ সরে যাওয়ার মতো বিষয়গুলোও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আত্মসমালোচনা ও উত্তরণের উপায়: করণীয় কী?
উপজেলার শিক্ষার মানকে এই বেহাল দশা থেকে উদ্ধার করতে এখনই সম্মিলিত উদ্যোগ ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। নিচে কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা তুলে ধরা হলো:
বিশেষ পাঠদান ও রিমেডিয়াল ক্লাস: যেসব বিষয়ে শিক্ষার্থীরা বেশি ফেল করছে বা পিছিয়ে আছে, সেগুলোর জন্য অতিরিক্ত বা বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা করা।
শিক্ষক-অভিভাবক সভা (PTC): নিয়মিত অভিভাবক সমাবেশ করে শিক্ষার্থীদের ঘরের পড়াশোনার খোঁজ নেওয়া এবং তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা।
জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ: কলেজ কর্তৃপক্ষ ও গভর্নিং বডির পক্ষ থেকে শিক্ষকদের পাঠদানের মান নিয়মিত মনিটরিং করা।
প্রেরণা ও কাউন্সেলিং: শিক্ষার্থীদের মনোবল বাড়াতে এবং পরীক্ষার ভীতি দূর করতে নিয়মিত মোটিভেশনাল বা কাউন্সেলিং সেশনের আয়োজন করা।
শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ তৈরি: রাজনীতি বা অন্যান্য বাহ্যিক প্রভাব মুক্ত রেখে সম্পূর্ণ শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা।
আজমিরীগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্য এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় এই ফলাফল কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি বড় ধরনের সতর্কবার্তা। সময় এসেছে দলীয় বা ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে শিক্ষার মানোন্নয়নে স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষক, অভিভাবক এবং তরুণ সমাজকে একমঞ্চে দাঁড়িয়ে কাজ করার।